বাগেরহাটের মোংলায় ওয়াকফ দলিল আড়ালে রেখে মসজিদের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ | বঙ্গ নিউজ
হোম / Uncategorized / বিস্তারিত

বাগেরহাটের মোংলায় ওয়াকফ দলিল আড়ালে রেখে মসজিদের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ

25 August 2026, 3:52:00

 

মোঃ আবু বকর সিদ্দিক বাগেরহাট:
মসজিদের নামে ওয়াকফ করা সম্পত্তি। সেই সম্পত্তিতে রয়েছে দোকান ও ভাড়ার ঘর। মাসে উঠছে ৫০ থেকে ৫১ হাজার টাকা ভাড়া। অভিযোগ, বছরের পর বছর সেই অর্থ মসজিদের ফান্ডে জমা না দিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছেন মোতোয়ালি ও তার স্বজনরা। শুধু ভাড়াই নয়, মসজিদের কথা বলে দোকানিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা জামানত। এরই মধ্যে ওয়াকফের দলিল গোপন করে ওই সম্পত্তি নিজের সন্তানদের নামে দলিল করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে মোংলার মাদানী জামে মসজিদের মোতোয়ালি একে মহি উদ্দিন বুলুর বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তি ও আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার এবং মোতোয়ালি ও সহ-মোতোয়ালির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমি।

অভিযোগ ও স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের পাশে ঠাকুরানী খালের সুইচগেট সংলগ্ন এলাকায় সরকারি বরাদ্দ দেওয়া ১৭ দশমিক ০৬ শতক জমিতে মাদানী জামে মসজিদ নির্মিত হয়। মসজিদের আয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে স্থানীয় বাসিন্দা একে নাজিম উদ্দিন ১৯৭৫ সালের ২৯ জুলাই ১৬৭৬৭ নম্বর দলিলের মাধ্যমে দ্বিতল ভবনসহ ৬ শতক জমি মসজিদের নামে ওয়াকফ করে দেন। পরে ওই সম্পত্তি ওয়াকফ স্টেটে তালিকাভুক্ত হয়।

নাজিম উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার সন্তান এবং ওয়াকফ দলিলের সাক্ষী একে মহি উদ্দিন বুলু মসজিদের মোতোয়ালির দায়িত্ব নেন। এরপর থেকেই ওয়াকফ সম্পত্তির ভাড়া ও জামানার অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে।

স্থানীয় মুসল্লি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, বেল্লাল ফকির, মো. ফিরোজ ও শাহারুল সর্দারের অভিযোগ, ওয়াকফ করা ভবনের নিচতলায় ১০টি দোকান এবং ওপরতলায় বাসা রয়েছে। এসব দোকান ও বাসা থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৫১ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। আগে মহি উদ্দিন বুলু নিজেই ভাড়া তুললেও বর্তমানে তার ছেলে নুর উদ্দিন ও মেয়ে শারমিন ভাড়া আদায় করছেন।

তাদের দাবি, নাজিম উদ্দিনের মৃত্যুর পর থেকে ওই ভাড়ার অর্থ মসজিদের ফান্ড, ব্যাংক হিসাব কিংবা মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাছে জমা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে মসজিদের সম্পত্তির ঘর ভাড়া দেওয়ার সময় জামানত হিসেবে প্রায় ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভাড়া ও জামানতের অর্থ মসজিদের কাজে ব্যবহার না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে ওয়াকফ সম্পত্তির দলিল নিয়ে। মসজিদের নামে করা ওয়াকফ দলিল গোপন করে মহি উদ্দিন বুলু ওয়ারিশসূত্রে মালিকানা দেখিয়ে তার ছেলে নুর উদ্দিন ও মেয়ে শারমিনের নামে ওই সম্পত্তি দলিল করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাদ্রাসা রোডসংলগ্ন ওয়াকফ সম্পত্তিতে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে কল্পনা জুয়েলার্স ও বৌরানী জুয়েলার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। কল্পনা জুয়েলার্সের মালিক সুজন দত্ত জানান, মসজিদের প্রয়োজনের কথা বলে তার কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা জামানত নেওয়া হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই অর্থ মসজিদের ফান্ডে জমা হয়নি।

বৌরানী জুয়েলার্সের মালিক সমীর দত্ত জানান, মসজিদের কথা বলে তার কাছ থেকেও ১২ লাখ টাকা জামানত নেওয়া হয়েছে। তবে ওই টাকা মসজিদের ফান্ডে জমা দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। দোকান ছাড়তে চাইলেও জামানতের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তারা।

মাদানী জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন বলেন, সরকারি বরাদ্দ দেওয়া ১৭ দশমিক ০৬ শতক জমিতে মসজিদের পুরোনো ভবন ও সাতটি দোকানঘর রয়েছে। দোকানঘরের ভাড়া এবং মুসল্লিদের দানের অর্থ দিয়ে মসজিদ পরিচালিত হয়। ওয়াকফ সম্পত্তি ও ভবন থেকে পাওয়া কোনো অর্থ মোতোয়ালি মসজিদ পরিচালনা কমিটিকে দেন না।

এদিকে ওয়াকফ স্টেট খুলনা বিভাগের কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান জানান, ওয়াকফ স্টেটের খুলনা কার্যালয়ে মাদানী মসজিদের ৬ শতক জমিসহ ভবনের দলিল দাখিল করা আছে। মোতোয়ালি মহি উদ্দিন বুলু ওয়াকফ স্টেটকে মসজিদসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে থাকা সাতটি দোকানের ভাড়ার হিসাব দিয়েছেন। তবে সরকার মসজিদের জন্য ১৭ দশমিক ০৬ শতক জমি বরাদ্দ দিয়েছে—এ তথ্য তাদের জানা ছিল না। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে মসজিদের সহ-মোতোয়ালি নুর উদ্দিন বলেন, তার দাদা একে নাজিম উদ্দিন ভুলবশত ওই ভবন ও জমি ওয়াকফ করেছিলেন।

অন্যদিকে মোতোয়ালি একে মহি উদ্দিন বুলু বলেন, তার ছেলে নুর উদ্দিন ভয় দেখিয়ে জোর করে তার কাছ থেকে ওই জমির দলিল করে নিয়েছে। সেখানে মেয়েকেও কিছু অংশ দেওয়া হয়েছে। মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তির ভাড়ার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার মেয়ে শারমিন অনেক টাকা দেনা রয়েছেন। মেয়ের জামাই ব্যবসার কাজে ঋণগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়ায় ভাড়ার টাকা মেয়ের দেনা পরিশোধে ব্যয় করতে হয়।

মসজিদের সম্পত্তি ও আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি মোতোয়ালি ও সহ-মোতোয়ালির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমি। তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশ্ন উঠেছে, মসজিদের নামে ওয়াকফ করা সম্পত্তির আয় যদি মসজিদের কাজে না-ই আসে, তাহলে বছরের পর বছর সেই অর্থ গেল কোথায়? আর ওয়াকফের দলিল থাকার পরও কীভাবে সেই সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় দলিল হলো—তদন্তেই বেরিয়ে আসবে এর প্রকৃত উত্তর।

বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইট থেকে কোনো তথ্য গ্রহণ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আমাদের অনুমতি ব্যতীত বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইটের কোনো সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য কনটেন্ট হুবহু বা আংশিক কপি, সংরক্ষণ, ব্যবহার বা পুনঃপ্রকাশ করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয়। এই ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আমাদের কনটেন্ট ব্যবহার করতে চাইলে অনুগ্রহ করে আগে আমাদের লিখিত অনুমতি গ্রহণ করুন।

 বঙ্গ নিউজ কর্তৃপক্ষ

মন্তব্য: