পাইকগাছায় আইনের তোয়াক্কা না করে বহাল তবিয়তে ভারতীয় নাগরিক প্রধান শিক্ষক দীপক

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি।।
খুলনার পাইকগাছায় ভারতীয় নাগরিকত্বের অভিযোগে আলোচিত খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা উঠে এলেও এখনো কোনো কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসনের দপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে তার ভারতীয় ভোটার হওয়ার তথ্য উল্লেখ থাকলেও তিনি স্বপদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২৯ জুন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হয়েও খুলনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে তৎপরতা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের কথিত দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগকারী স্থানীয় বাসিন্দা প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব, নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, বিদ্যালয়ের বরাদ্দের অর্থে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ ও তদন্ত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে জানা যায়, পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর বর্ধমান জেলার শক্তিগড় থানার বরশুল এলাকার একটি ঠিকানায় তার নাম পাওয়া গেছে। একই ব্যক্তি বাংলাদেশের পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামের ভোটার বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যও দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন। এদিকে দেশে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪ সালের ১২ জুলাই বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া পদে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেন হয়েছে। নিয়োগের বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়রা প্রতিবাদে ঝাড়ু মিছিল, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপি প্রদান করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তী সময়ে চাকরিবিধি অনুসরণ না করেই নিয়োগপ্রাপ্তদের বিদ্যালয়ে হাজির করা হয়। এ নিয়োগে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রণোদনা অনুদানের প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে শিক্ষক, সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দের একটি অংশ যথাযথভাবে ব্যয় হলেও অবশিষ্ট অর্থের ব্যয়সংক্রান্ত বিল-ভাউচার যথাযথ নয় বলে উল্লেখ করা হয়। নথিপত্র অনুযায়ী, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স কর্মকর্তা মো. ঈমান উদ্দিন ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি আরেকটি প্রতিবেদন দেয়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমানও বিষয়টি তদন্ত করেন। সর্বশেষে ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব রয়েছে। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়। ফলে কোনো বিদেশি নাগরিকের এমপিওভুক্ত পদে থাকা বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ ও বিতর্কিত। এর পরিপ্রেক্ষিতে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বিষয়টি গুরুতর ও স্পর্শকাতর উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বেসরকারি মাধ্যমিক-১) মো. জাকির হোসেন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারকে প্রথমে ১০ কার্যদিবসের সময় দিয়ে শোকজ করা হয়। তিনি নির্ধারিত সময়ে জবাব না দেওয়ায় দ্বিতীয় দফায় নোটিশ দেওয়া হয়। পরে তিনি লিখিত জবাব দিয়েছেন। তদন্তের সব প্রতিবেদন মহাপরিচালকের দপ্তরে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখান থেকে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার বলেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং নিজে ভারতে ভোটার হননি। তাকে ফাঁসাতে কেউ ভারতের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে দাবি করেন তিনি। বিদ্যালয়ের অনুদান আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। এদিকে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক নথিতে অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসার পরও দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—তদন্তে অভিযোগের সত্যতা উঠে আসার পরও কেন এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক?
বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইট থেকে কোনো তথ্য গ্রহণ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আমাদের অনুমতি ব্যতীত বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইটের কোনো সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য কনটেন্ট হুবহু বা আংশিক কপি, সংরক্ষণ, ব্যবহার বা পুনঃপ্রকাশ করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয়। এই ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আমাদের কনটেন্ট ব্যবহার করতে চাইলে অনুগ্রহ করে আগে আমাদের লিখিত অনুমতি গ্রহণ করুন।
বঙ্গ নিউজ কর্তৃপক্ষ

























মন্তব্য: