তেরখাদায় বাঁশের লাঠি হাতে রাত জাগছেন তরুণরা, মাদকের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে প্রতিরোধ | বঙ্গ নিউজ
হোম / Uncategorized / বিস্তারিত

তেরখাদায় বাঁশের লাঠি হাতে রাত জাগছেন তরুণরা, মাদকের বিরুদ্ধে গড়ে উঠছে প্রতিরোধ

30 August 2026, 6:39:31

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাত নামলেই হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে পাড়া-মহল্লায় বেরিয়ে পড়েন একদল তরুণ। গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাদের পাহারা। মাদকের সম্ভাব্য আড্ডাস্থল, নির্জন সড়ক কিংবা এলাকার অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে নজর রাখছেন তারা। অপরিচিত কাউকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখলে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন। মাদকসেবী কিংবা কারবারিদের বিষয়ে তথ্য পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর উদ্যোগও রয়েছে তাদের।
খুলনার তেরখাদা উপজেলার পশ্চিমপাড়ায় কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে শুরু হওয়া এমন রাতের পাহারা এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে সামাজিক প্রতিরোধে। মাদকের পাশাপাশি জুয়া, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তরুণদের এই কার্যক্রমকে সাংগঠনিক রূপ দিতে গঠন করা হয়েছে ৬১ সদস্যের ‘তেরখাদা পশ্চিমপাড়া মাদকবিরোধী যুব পরিষদ’।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে জয়সেনা বাজারের হাটখোলায় মাদক ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে আয়োজিত আলোচনা সভা শেষে কমিটিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সোহেল রানাকে সভাপতি ও সামিউল ইসলাম মিদুলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।
জয়সেনা বাজার নূরানী ও এতিমখানা মাদ্রাসার সভাপতি মুজিবুর রহমান শেখের সভাপতিত্বে সভাটি পরিচালনা করেন মো. জাবের আলী।
সভায় তেরখাদা উপজেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহ্বায়ক চৌধুরী কাওসার আলী, তেরখাদা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. তহিদুল ইসলাম, বিএনপি নেতা সরদার আব্দুল মান্নান, সাজ্জাদ হোসেন নান্টা, শরীফ নাঈমুল হক, মোল্লা হুমাউন কবির, বিল্লাল হোসেন ও আজিজুর রহমান আজিবার বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া যুবদল নেতা চৌধুরী আমিনুল ইসলাম মিলু, গোলাম মোস্তফা ভুট্টো ও অহিদ শেখ, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শামীম আহমেদ রমিজ, ছাত্রদল নেতা সাব্বির আহমেদ টগর, সাবেক ছাত্রদল নেতা রাজু শেখ, রাজু চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন নষ্ট করে না, এর প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজে। মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে নানা ধরনের অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় তৈরি হয়। তাই তরুণ প্রজন্মকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।
তারা বলেন, মাদক, জুয়া, ধর্ষণসহ সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি। স্থানীয় তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই উদ্যোগ সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে যুব পরিষদের কমিটি গঠনের আগেই পশ্চিমপাড়ায় রাতের পাহারা শুরু করেন কয়েকজন তরুণ। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আরও অনেকে। কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে তারা রাতের বিভিন্ন সময়ে এলাকায় ঘোরেন। মাদকের সম্ভাব্য স্পটগুলোতে নজর রাখেন এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজ নেন।
তরুণদের এই উদ্যোগে ধীরে ধীরে এলাকার বয়স্ক মানুষজনও সম্পৃক্ত হচ্ছেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট এলাকার তরুণদের উদ্যোগ এখন স্থানীয়দের সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধে রূপ নিতে শুরু করেছে।
সম্প্রতি জয়সেনা বিলের কাছে একটি পরিত্যক্ত এলাকায় টিন দিয়ে তৈরি একটি ঘরে মাদকসেবন ও বিক্রির আড্ডা বসত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পরে তরুণদের উদ্যোগে ওই আড্ডা বন্ধ করে ঘরটি উচ্ছেদ করা হয়।
পশ্চিমপাড়া মাদকবিরোধী যুব পরিষদের সভাপতি ও জয়সেনা বাজার বণিক সমিতির সেক্রেটারি শেখ সোহেল তাজ বলেন, মাদকের বিস্তার এখন শুধু শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। প্রত্যন্ত এলাকাতেও এর প্রভাব রয়েছে। তাই নিজেদের এলাকা রক্ষায় স্থানীয় মানুষকেই সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, তরুণরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে রাতে পাহারা দিচ্ছেন। হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে মাদক বিক্রির সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। অপরিচিত কাউকে সন্দেহ হলে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তথ্য পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হচ্ছে।
তার দাবি, তরুণদের এই উদ্যোগের পর এলাকায় মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনা অনেকটাই কমেছে।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত তরুণদের উৎসাহ দিতে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসক রবিউল ইসলাম। অভিযানে থাকা কোনো তরুণ অসুস্থ হলে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
রবিউল ইসলাম বলেন, তার পরিবারের একজন সদস্য মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে মাদকের কারণে একটি পরিবারকে কী ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়, সেটি তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। সাধারণত মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দেখা যায়। কিন্তু এলাকার তরুণরা নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে রাতে মাঠে নামায় তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, তরুণদের এই উদ্যোগ দেখে অন্যরাও মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার উৎসাহ পাচ্ছেন।
স্থানীয় অভিভাবকদের কয়েকজন জানান, তরুণরা রাতে এলাকায় পাহারা দেওয়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাদকের সংস্পর্শে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে এ ধরনের সামাজিক নজরদারি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
নবগঠিত যুব পরিষদের নেতারা জানান, মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে শুধু রাতের পাহারায় সীমাবদ্ধ রাখতে চান না তারা। মাদক, জুয়া ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়েকজন তরুণের হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে রাতের পাহারা দিয়ে যে উদ্যোগের শুরু, সেটিই এখন সাংগঠনিক রূপ পেয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তেরখাদার পশ্চিমপাড়ায় শুরু হওয়া এই সামাজিক প্রতিরোধ আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে এবং মাদক ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের সম্মিলিত অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইট থেকে কোনো তথ্য গ্রহণ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আমাদের অনুমতি ব্যতীত বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইটের কোনো সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য কনটেন্ট হুবহু বা আংশিক কপি, সংরক্ষণ, ব্যবহার বা পুনঃপ্রকাশ করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয়। এই ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আমাদের কনটেন্ট ব্যবহার করতে চাইলে অনুগ্রহ করে আগে আমাদের লিখিত অনুমতি গ্রহণ করুন।

 বঙ্গ নিউজ কর্তৃপক্ষ

মন্তব্য: