খুলনার ৬০৫ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক সংকট দিন দিন বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। জেলার ১ হাজার ১৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০৫টিতেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার প্রায় ৫৩ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে ডুমুরিয়ায় ২১৩টি বিদ্যালয়ের ১১৩টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। পাইকগাছায় ১৬৭টির মধ্যে ৭৩টি, কয়রায় ১৪২টির মধ্যে ৮৫টি, দাকোপে ১১৯টির মধ্যে ৫৫টি এবং বটিয়াঘাটায় ১১৫টির মধ্যে ৫২টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।
এ ছাড়া তেরখাদার ১০২টি বিদ্যালয়ের ৬২টি, রূপসার ৬৮টির ৩৭টি, ফুলতলার ৫৭টির ৩৯টি এবং দিঘলিয়ার ৫০টির মধ্যে ৩৩টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ খালি রয়েছে।
খুলনা মহানগরেও প্রধান শিক্ষক সংকট রয়েছে। থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর সাতটি ক্লাস্টারের ১২৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শিশু কল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে।
নগরীর ১ নম্বর ফুলবাড়ি বি কে ক্লাস্টারের ১৭টি বিদ্যালয়ের চারটিতে, ২ নম্বর বীণাপাণি ক্লাস্টারের ১৯টির নয়টিতে, ৩ নম্বর স্যাটেলাইট ক্লাস্টারের ১৫টির পাঁচটিতে এবং ৪ নম্বর কাজী আব্দুল বারী ক্লাস্টারের ১৭টির সাতটিতে প্রধান শিক্ষক নেই। ৫ নম্বর সোনাডাঙ্গা ক্লাস্টারের ২৩টির দুটি, ৬ নম্বর সোনাপোতা ক্লাস্টারের ২০টির ছয়টি এবং ৭ নম্বর দক্ষিণ টুটপাড়া ক্লাস্টারের ১৬টির ছয়টি বিদ্যালয়েও প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, সদরের জহির উদ্দিন গণবিদ্যালয় ও সোনাডাঙ্গা আবু বকর খান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে মামলা চলছে। এ কারণে ওই দুটি বিদ্যালয়ে আপাতত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। নগরীর ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ক্লাস্টারে শিক্ষকরা শহরমুখী হওয়ায় সেখানে শিক্ষক সংকট তুলনামূলক কম। অন্য চারটি ক্লাস্টারে সংকট বেশি।
প্রধান শিক্ষক না থাকার সঙ্গে খুলনায় সহকারী শিক্ষক সংকটও রয়েছে। জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৬ হাজার ৩০৭টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন ৫ হাজার ৭৯৭ জন। ফলে ৩৯৮টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
শিক্ষকরা জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকলে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে হয়। তাকে একই সঙ্গে ক্লাস নিতে হয় এবং বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ, সভা, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদানের সময় কমে যায়।
বিশেষ করে যেসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকও কম, সেখানে সমস্যা আরও বেশি। একদিকে শিক্ষকরা অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে চাপের মধ্যে পড়ছেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অভিভাবকদেরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের নিয়ম-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম ঠিকভাবে পরিচালনা এবং শিক্ষার পরিবেশ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বড় পরিসরে সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। এর সঙ্গে পদোন্নতি ও নিয়োগ নিয়ে আইনি জটিলতা যুক্ত হওয়ায় শূন্য পদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার কথা। পদোন্নতির জন্য সহকারী শিক্ষক হিসেবে ১২ বছরের অভিজ্ঞতা ও চাকরি স্থায়ীকরণের শর্ত রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জটিলতার পেছনে দীর্ঘদিনের একটি মামলাও রয়েছে। ২০১৭ সালে জাতীয়করণকৃত শিক্ষকরা ২০১৩ সালের ‘অধিগ্রহণকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধিমালা-২০১৩’-এর বিধি ৯(১)-এর একটি ধারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ২০১৯ সালের মার্চে হাইকোর্ট জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেন। পরে সরকার আপিল করলে বিষয়টি দীর্ঘদিন আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে থাকে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের আপিল মঞ্জুর করে রায় দেওয়ায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির আইনি বাধা দূর হয়েছে। এখন শূন্য পদ পূরণের পথ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম বলেন, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ সম্পন্ন হলে সংকট দ্রুত কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খুলনা সদরের থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শাহনাজ বেগম বলেন, সদরের বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমের তদারকি ব্যাহত হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করায় পাঠদান ও দাপ্তরিক কাজেও সমস্যা হচ্ছে। আইনি বাধা দূর হওয়ায় দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ হবে বলে আশা করছেন তারা।
বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইট থেকে কোনো তথ্য গ্রহণ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আমাদের অনুমতি ব্যতীত বঙ্গ নিউজ ওয়েবসাইটের কোনো সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা অন্যান্য কনটেন্ট হুবহু বা আংশিক কপি, সংরক্ষণ, ব্যবহার বা পুনঃপ্রকাশ করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয়। এই ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আমাদের কনটেন্ট ব্যবহার করতে চাইলে অনুগ্রহ করে আগে আমাদের লিখিত অনুমতি গ্রহণ করুন।
বঙ্গ নিউজ কর্তৃপক্ষ

























মন্তব্য: