নিজস্ব প্রতিবেদক:
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই পদপ্রার্থীদের সঙ্গে কথিত আর্থিক চুক্তি, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অডিটের নামে অর্থ নেওয়া, কলেজের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিভিন্ন খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে খুলনার রূপসা উপজেলার আলাইপুর ডিগ্রি কলেজে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খান। অভিযোগগুলোর প্রতিকার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
১৯৯৪ সালের ২০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত আলাইপুর ডিগ্রি কলেজটি দীর্ঘদিন ধরে রূপসার শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খানের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কলেজের গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য পুটিমারী এলাকার বাসিন্দা মো. আঃ হালিম শেখ এসব বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কলেজের বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। সাবেক অধ্যক্ষ, নাইট গার্ড ও দুই ল্যাব সহকারীসহ চারজন কর্মচারী নিয়োগে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে ২০২৩ সালের ২২ আগস্ট উপাধ্যক্ষ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী/এমএলএসএস পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই যথাক্রমে ১৭ লাখ ও ৮ লাখ টাকার কথিত চুক্তি হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই যদি কোনো প্রার্থীর সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে চুক্তি হয়ে থাকে, তাহলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ বা ব্যাংক লেনদেনের নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। সংশ্লিষ্ট নিয়োগের কাগজপত্র ও গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত যাচাই করা হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খানের উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে আসার প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন কলেজ পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান। পরে ২০২৩ সালে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। উপাধ্যক্ষ পদে থাকাকালে পদটি যথাযথভাবে শূন্য না করেই নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং একই সময়ে বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
কলেজের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ কম নয়। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে মন্ত্রণালয়ের অডিট রিপোর্ট পাওয়ার কথা বলে শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাছ থেকে এক মাসের বেতনের অর্ধেক টাকা নেওয়া হয়। পরে অডিটের জন্য ওই অর্থ ব্যয় করা হয়নি বলে শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশ জানতে পারেন। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
ব্যাংক হিসাব পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, গভর্নিং বডির বাইরে থাকা তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান মো: কামাল উদ্দিন বাদশা কলেজের ব্যাংকের যৌথ হিসাব পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এরপর কয়েক বছর ধরে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, টিউশন ফি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভাউচার, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং গভর্নিং বডির অনুমোদন যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আলাইপুর ডিগ্রি কলেজে কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। বরং সেদিন প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ও তালাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। এ ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা ও কলেজ কর্তৃপক্ষের অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সুধাংশু গাইনের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বিভিন্ন সময়ে দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করেও বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন এবং দেশে ফিরে আগের তারিখে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ছুটির নথি, হাজিরা খাতা, বিদেশযাত্রার তথ্য এবং বেতন-ভাতার রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারী মো. আঃ হালিম শেখ বলেন, কলেজের স্বার্থেই তিনি বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। কলেজের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তিনি এসব অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসীর কয়েকজনও অভিযোগগুলোর তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক অভিযোগ ওঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। তাঁরা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আলাইপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদ খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এতে তাঁর কোনো সমস্যা নেই।
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান,নির্বাহি সম্পাদক : মোঃ বেনজীর হোসেন,বার্তা সম্পাদক : চন্দন ভট্টাচার্য্য, উপদেষ্টা : এ্যাড. সরদার আবুল হাসেম ডাবলু, উপদেষ্টা : তরুন চক্রবর্তী বিষ্ণু। মোবাইল : 01639924798, অফিস : রামনগর (মজিবর মোড়) , রূপসা, খুলনা।1260